Home>সকল সংবাদ>জাতীয়>কম্বল থাকবে না! – মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন
জাতীয় প্রতিবেদন

কম্বল থাকবে না! – মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন

শেখ হাসিনার দুর্নীতিবিরোধী অভিযান দেখে আমার মনে বারবার নোয়াখালী অঞ্চলের গ্রামীণ সংস্কৃতির অনেকটা প্রবাদ-প্রবচনের মতো কথাটি মনে পড়ে: কম্বলের লোম (পশম) তুলতে গেলে শেষ পর্যন্ত কম্বল থাকে না । আমার মনে হয় বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলেও এই ধরনের কথা প্রচলিত আছে। আমার মনে হয় কোন সংকটের গভীরতা ও ব্যাপক নিরসনে প্রকৃত উদ্যোগের বিপরীতে নামমাত্র উদ্যোগকে ব্যাঙ্গ করতে এমন কথার উদ্ভব হয়েছে।

দলীয় লোকদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার এই অভিযান কতোখানি আন্তরিক তা-ই দেখার বিষয়। শেখ হাসিনাকে জানেন ও বুঝেন এমন তথ্যাভিজ্ঞমহল মনে করেন শেখ হাসিনা সরকার তার দলীয় দুর্নীতিবাজদের দমন করতে এবং এ বলয় হতে বের হয়ে আসতে  যে আন্তরিক, কোন নির্বোধও তা বিশ্বাস করবে না। কারণ ১২টা বছর তিনি দলীয় লোকদের জঘন্যতম অন্যায় করার সুযোগ দিয়েছেন। তিনি এখন দলকে দুর্নীতিবাজমুক্ত করবেন, এমন ধারণা বিবেচনার মধ্যেই আসে না। তার চলমান উদ্যোগ লোক দেখানো  এবং দেশের প্রকৃত সমস্যা হতে দেশবাসীর দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেয়ার পন্থা।  এটা তার ইমেজ জিরো ইমেজ থেকে বেরিয়ে আসার অসার চেষ্টার প্রচারণার মশলা।

ইতোমধ্যেই দুর্নীতির সারিতে থাকা  তার দলের মোসাহেব-চাটুকার বাহিনীর যেসব সদস্যরা  এই উদ্যোগকে বাহাবা দিচ্ছেন এবং এরফলে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বাড়ার কাহিনী প্রচার করছেন, তারাও বুঝেন এটা কেবল লোক দেখানো প্রহসনই নয়, বরং ধোকাবাজি ও প্রতারণা। এই বাহিনী নিজেরা স্বচছ ও সৎ, এরা কোনভাবেই দেশ ও জনগণের সম্পদ অবৈধভাবে হাতিয়ে নেন নি, এমন কাউকে পাওয়া অতীব কঠিন।
গত ১২ বছরে বাংলাদেশের জনগণের অর্থ-সম্পদ কী হারে আওয়ামী অনুসারী এবং তাদের সহযোগী ইনু, মেনন, এরশাদবাহিনী লুটেছে তার অতি সামান্য কাহিনী  মাত্র দুই মহাসৈনিকের ‘আমলালামায়’   (শেখ হাসিনার ভাষায়) দেখা গেছে। এই দুইজনের কিংবা ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতাসহ এই পর্যন্ত যাদেরকে ধরা হয়েছে তারা কেউই তথাকথিত মন্ত্রী, এমপি, এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও নন। এরা শেখ হাসিনার লড়াকু মহাসৈনিক। এদের অজানা সমুদয় অর্থের অতি সামান্যাংশের পরিমাণ যদি এতো বিপুল হয়, তবে মন্ত্রী, এমপি, সচিব, পুলিশ-র‌্যাবের কর্মকতা ও সদস্যবৃন্দ, দুর্নীতি দমন কমিশন, নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে থানার ওসি, দারোগা, সিপাহী, কেরানী, এমনকি আওয়ামী লীগের গ্রামীণ নেতা-কর্মীদের আমললামা আরো ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে আসবে। তারা সবাই নিজ নিজ এলাকার মহারাজা। নিরীহ মানুষের জমি-দোকান দখল থেকে অব্যাহতি পেতে, ঘর-বাড়ি নির্মাণ করতে, এমনকি নির্বিঘেœ ছেলেমেয়ে বিয়ে দেয়ার জন্য মহাসৈনিকদেরকে সম্মানী দিতে হয়। গ্রামীণ হাট তোলার জন্য ইজারা নিতে, মাছ ধরতে, এমনকি রিকসা চালালেও তাদেরকে পয়সা দেয়ার কাহিনী শুনেছি। এদের টাকা আদায়ের কিংবা অকারণে অত্যাচারের আমললামা কে দেখবে? কে এদেরকে ধরবে। আওয়ামী পরিবারের প্রায় প্রত্যেক নেতাকর্মীই নিজ নিজ এলাকায় ভয়ঙ্করের প্রতীক।

পত্রিকায় দেখেছি নরসিংদি রেলস্টেশন থেকে ১০/১২জন যুবক গাড়িতে ওঠেন। ওদের দু’একজনের বুকে কোন কোন নেতার মুখোচ্ছবি ঝুলানো। টিটি টিকেট চাইলে তাকে বলা হয়: বুঝতে পারছো না – আমরা ছাত্রলীগের লোক। টিটি বেচারা মান-ইজ্জত নিয়ে কেটে পড়েন। হোটেলে খাবার খেয়ে পয়সা না দিয়ে চলে যাওয়া অতি সাধারণ ঘটনা। পয়সা চাইলে চড়্-থাপ্পড় খেতে হয়। আরো বড় কোন ক্ষতির হুমকি দেয়া হয়। এদের হাতে পুলিশ, ওসি, আমলা, এমনকি ডিসি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কিল-ঘুষি খেয়েছেন, হয়তো আরো খাবেন। এরাই বিরোধীদলের সভা-সমাবেশ ভেঙ্গে দেয়। বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের পিটায়। এরাই ২২  সেপ্টেম্বর ছাত্রদলের নতুন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে নির্বিঘেœ বৈঠক করতে দেয় নি। ২৩  সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগের নেতাকর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায়। ছাত্রলীগের হামলাকারীরা কয়েকজনকে নির্দয়ভাবে পিটিয়ে অজ্ঞান করে নির্বিঘেœ চলে যায় যে দৃশ্য সময় টিভিসহ অন্যান্য চ্যানেলের পর্দায় দেখানো হয়। এরাই সব অপরাধ করেও রেহাই পায়। এরাই অবৈধ সম্পদ অর্জনে লিপ্ত হয়। শিক্ষার্থী হয়েও এরা ঢাকাতে বিলাসবহুল গাড়ি-বাড়ি-ব্যবসার মালিক হয়। কোন সূত্র থেকে এরা অর্থ পায়? এরা নাকি মাদক ব্যবসায়ী? অস্ত্র ব্যবসায়ী?  হলের ভিতরেই এদের দোকান! এদের অত্যাচারে অন্যান্যরা হলে থাকতে পারে না।

এদের কোন বিচার হয় না। এদের কোন শাস্তি নেই। এদের আমললামা কোথায়? এদেরকে শেখ হাসিনারা কী চেনেন? এরাই তার লড়াকু সৈনিক। এদের কুকৃর্তির তথ্য লিখতে হলে কয়েকহাজার বিশ্বকোষ লিখলেও শেষ হবে না। আমরা কেবল পত্রিকা থেকে নেয়া মাত্র দুই মহাসৈনিকের আমলালামার অংশবিষেশ ঢাকার বিভিন্ন দৈনিক থেকে যোগাড় করে এখানে তুলে ধরতে চাই।
২০ সেপ্টেম্বর যুবলীগ নেতা জি কে শামীমের ঢাকার নিকেতনের ডিব্লকের ৫ নম্বর রোডের ১৪৪ নম্বর অফিসে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব নগদ ২০০ কোটি টাকা,  ১২৫ কোটি টাকার এফডিআর, মদের বোতল ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। টাকার পরিমাণ এতো বেশি ছিল যে, দৈনিক প্রথম আলোর ভাষায়: “টাকা গুনে কূল পাচ্ছেন না র‌্যাবের ম্যাজিস্ট্রেটসহ কর্মকর্তারা। তার কয়েকটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আরও কয়েক শত কোটি টাকা পাওয়ার তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সিঙ্গাপুরে তার একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ডে বিপুল অর্থের খবর পাওয়া গেছে। তিনি বিদেশে টাকা পাচারের কথা স্বীকার করেছেন, তবে টাকার পরিমাণ বলেন নি, হয়তো বিশাল অংকের কথা তার মনেই নেই, কিংবা তিনি তা ইচ্ছাকৃতভাবেই গোপন রেখেছেন।

মানবজমিন জানায় চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি করে বাসাবোর কদমতলা, ডেমরা, দক্ষিণগাঁও এলাকায় বাড়ি করেছেন। গুলশান, নিকেতন ও বনানী পুরনো ডিওএইচএস এলাকায় তার ডজন খানেক ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া সোনারগাঁও, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় তার কোটি কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। গ্রামের বাড়িতে বাড়ি রয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে একাধিক পত্রিকা জানিয়েছে, নিকেতন ও বাসাবো এলাকায়  শামিমের অন্তত ১০টি বহুতল ভবন আছে। বাসাবোতে ১টি বড় বানিজ্যিক প্লট, বান্দরবানে তিন তারকা মানের একটি হোটেল রয়েছে। অভিযোগ আছে দেশের বাইরে বিভিন্ন বিভিন্ন দেশে তার বড় ধরনের বিনিয়োগ আছে। কয়েকটি দেশে তার বাড়ি ও বাণিজ্যিক সম্পত্তি রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায়বিষয়ক সম্পাদক পদ হাতিয়ে নেয়ার পর শামীমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান জিকেবি এন্ড কোম্পানি (প্রাইভেট) লিমিটেড ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ নেয়। গণপূর্তেও আধিপত্য বিস্তার করেন জিকে শামীম। অধিংকাংশ কাজ নিজ প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দেয়ার পাশাপাশি অন্য ঠিকাদাররা যে কাজ পেতেন সেখান থেকেও মোটা অঙ্কের কমিশন নিতেন তিনি। এসব কিছুই করতেন যুবলীগের পরিচয় ব্যবহার করে।

বিভিন্নি দপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারী এবং দলীয় লোকদেরকে বিরাট অংকের অর্থ ঘুষ দিয়ে বিভিন্ন নির্মাণকাজের টেন্ডার বাগিয়ে নিতেন। মানবজমিন (অনলাইন) জানিয়েছে: রাজধানীর আশকোনায় র‌্যাবের সদর দপ্তর, গাজীপুরের পোড়াবাড়িতে র‌্যাব ট্রেনিং সেন্টার, ঢাকা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়, আগারগাঁওয়ে রাজস্ব ভবন, পঙ্গু হাসপাতাল, এনজিও ভবন, নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল, পাবলিক সার্ভিস কমিশন ভবন, বিজ্ঞান জাদুঘর,  সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নতুন ভবন, ক্যাবিনেট ভবন, বাসাবো  বৌদ্ধমন্দির, পার্বত্য ভবন, মিরপুর-৬ নম্বরের স্টাফ কোয়ার্টার, সেবা মহাবিদ্যালয় এবং মহাখালী ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণের কাজ তার প্রতিষ্ঠানই করছে।

এর মধ্যে রয়েছে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪০০ কোটি টাকার কাজ, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল  ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) ৪০০ কোটি টাকার কাজ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডাইজেস্টিভ, রিসার্চ এন্ড হসপিটালে (মহাখালী ডাইজেস্টিভ) ২০০ কোটি টাকার কাজ, এজমা সেন্টারে ২০-২৫ কোটি টাকার কাজ। এছাড়া জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ২০-২৫ কোটি টাকার কাজ, বাংলাদেশ সেবা মহাবিদ্যালয়ে ২০-২৫ কোটি টাকার কাজ, গাজীপুর র‌্যাব ট্রেনিং স্কুলের ৫৫০ কোটি টাকার কাজ, বেইলি রোডে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্সের ৩০০ কোটি টাকার নির্মাণ কাজ, সচিবালয়ের ক্যাবিনেট ভবণ নির্মাণে ১৫০ কোটি টাকার কাজ, এনবিআরের ৪০০ কোটি টাকার, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সের ১০০ কোটি টাকার কাজ, পিএসসিতে ১২ কোটি টাকার কাজ এবং এনজিও ফাউন্ডেশনে ৬৫ কোটি টাকার কাজ।

ঘুষ দিয়েই সব কাজের টেন্ডার পেয়েছেন শামিম। দৈনিক সমকাল জানায় তিনি টেন্ডার পেতে শুধু দুই কর্মকর্তাকেই ঘুষ দিয়েছিলেন দেড় হাজার কোটি টাকা। পত্রিকাটির প্রশ্ন একজন মানুষের কত টাকা থাকলে শুধু দুই কর্মকর্তাকেই দেড় হাজার কোটি টাকা ঘুষ দিতে পারেন।
দৈনিকটি জানায় কাজ পেতে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের সদ্য সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে সম্প্রতি ঘুষ হিসেবে দিয়েছেন ১১০০ কোটি টাকা। একই অধিদপ্তরের ঢাকা জোনের আরেক সদ্য সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুল হাইকে ঘুষ দিয়েছেন ৪০০ কোটি টাকা। তিনি জানান, প্রতি টেন্ডারে ৮ থেকে ১০ শতাংশ কমিশন দেয়া লাগতো তার। অনেক সময় নির্দিষ্ট কমিশনের পরও ঘুষ দিতে হতো। বাংলাদেশ প্রতিদিন (২৩ সেপ্টেম্বর) জানায়: জিজ্ঞাসাবাদে শামীম গণপূর্ত অধিদফতরের ২০ জন সাবেক সরকারি কর্মকর্তার নাম বলেছেন, যাদের মাসে ২-৫ লাখ টাকা দিতেন তিনি। এছাড়া আরও কয়েকজন বড় সরকারি কর্মকর্তাও শামীমের কমিশনভোগী ছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে শামীম দাবি করেছেন যে দুই প্রকৌশলী ছাড়াও যুবলীগের অন্তত দু’জন শীর্ষ নেতাকে মোটা অঙ্কের মাসোহারা দিতেন তিনি।
রূুপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের পাশে গ্রিনসিটি আবাসিক এলাকা নির্মাণের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২১টি আবাসিক ভবন নির্মাণের ওয়ার্কঅর্ডার পাওয়ার পর টেন্ডার মূল্যের ৫ শতাংশ বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুষ দিতে হয়েছে। এরমধ্যে সাবেক এক মন্ত্রী, সচিব, সাবেক প্রকৌশলীসহ আরও কয়েকজন রয়েছেন। কিন্তু বালিশ কা-ের পর শামীমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান জি কে বিপিএল কালো তালিকাভূক্ত হয়। কারণ গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে রূপপুরের ওই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে শামীমের প্রতিষ্ঠানই। একাধিক সূত্রে জানাগেছে, পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে শামীমের সখ্যতা ছিল। এ বিষয়টি সবাই খুব ভাল করে জানতো। মূলত এই প্রতিমন্ত্রীর কারণেই শামীম একের পর এক টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে নিত। আর কামিয়ে নিয়েছে শত শত কোটি টাকা।

ঢাকার একাধিক দৈনিক পত্রিকা জানিয়েছে, শামীম সরকার দলীয়, বিরোধী দলীয় রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব, দেশ পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। যে মন্ত্রণালয়ের যে কাজ আসত ওই মন্ত্রণালয় থেকে টেন্ডার নিতেন। তবে শামীমকে সব কাজেই শেল্টার দিতেন যুবলীগ দক্ষিণের এক শীর্ষ নেতা।
আওয়ামী মহলসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের তার সাথে শামিমের ঘনিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য তাদের সাথে তোলা ছবি অফিসে ঝুলিয়ে রাখতেন । ২১ সেপ্টেম্বর তার অফিসে অভিযান চলার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে, র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ, যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে তার ছবি পাওয়া গেছে।

আরেক মহাসৈনিক
শেখ হাসিনার আরেক মহাসৈনিক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার গুলশানের বাসা থেকে তাকে আটক করে র‌্যাব। এ সময় তার বাড়ি থেকে তিনটি অস্ত্র, গুলি, ৫৮৫ পিস ইয়াবা, ১০ লাখ ৩৪ হাজার ৫৫০ টাকা এবং ৬-৭ লাখ টাকা মূল্যের সমমান বিদেশী মুদ্রা জব্দ করা হয়েছে। মনে করা হয় খালেদের পুরো অর্থের সন্ধান এখনো উদ্ধার করা হয় নি।
একই দিন রাতে রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনের উল্টো দিকে ইস্টার্ন কমলাপুর টাওয়ারে খালেদের এই টর্চার সেলে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে জানিয়েছেন: খালেদের টর্চার সেলে যা দেখছি তাতে লোম শিউরে ওঠার মতো অবস্থা। কেউ চাঁদা না দিতে চাইলে টর্চার সেলে নিয়ে নির্মম নির্যাতন চালানো হতো। উচ্চ মাত্রায় সুদসহ পাওনা টাকা আদায়সহ সব ধরনের কাজে ব্যবহার করা হতো এই টর্চার সেল।

অভিযানকালে টর্চার সেল থেকে বৈদ্যুতিক শক দেয়ার অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, গায়ের চামড়া জ্বলে-জ্বালাপোড়া করে এমন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, বিপুল পরিমাণ লাঠি, হকিস্টিক, ১৯০ পিস ইয়াবা, ৫ ক্যান বিয়ার, ৭০০ গ্রাম সীসা, ১.৫ কেজি সীসা খাওয়ার কয়লা, ৩টি মোবাইল, ২টি ল্যাপটপ ও নগদ ২৩ হাজার ৫০০ টাকা জব্দ করা হয়েছে।
খালেদ সম্পর্কে পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য হলো: ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। মতিঝিল-ফকিরাপুল ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনো থেকে শুরু করে কমপক্ষে সাতটি সরকারি ভবনে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি জমি দখলের মতো নানা অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ২০১২ সালের পর মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের ছত্রচ্ছায়ায় ঢাকার এক অংশের নিয়ন্ত্রণ আসে খালেদের হাতে। নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করেন তিনি।

অভিযোগ থেকে জানা যায়, রাজধানীর মতিঝিল, ফকিরাপুল এলাকায় কমপক্ষে ১৭টি ক্লাব নিয়ন্ত্রণ করেন এই যুবলীগ নেতা। এর মধ্যে ১৬টি ক্লাব নিজের লোকজন দিয়ে আর ফকিরাপুল ইয়ংমেনস নামের ক্লাবটি সরাসরি তিনি পরিচালনা করেন। প্রতিটি ক্লাব থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে এক লাখ টাকা নেন তিনি। এসব ক্লাবে সকাল ১০টা থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত চলে জুয়া। সেখানে মাদকের ছড়াছড়ি। পাওয়া যায় ইয়াবাও।
বাংলাদেশ প্রতিদিন (২৪ সেপ্টেম্বর) জানায় যুবলীগ নেতা খালেদ জেরার মুখে অনেকের নাম ফাঁস করেছে। যুবলীগ আওয়ামী লীগ থেকে শুরু পুলিশ কর্মকর্তাদের নামও বলতে শুরু করেছে। পুলিশকে কী পরিমাণ টাকা দেওয়া হতো, তার হিসাবও দিয়েছেন ক্যাসিনো কিং খালেদ। সূত্র জানিয়েছে, খালেদ বলেছে, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি সম্রাটই ক্যাসিনোর আসল রূপকার। তাঁর হাত ধরেই ঢাকার মতিঝিল থানার বিভিন্ন এলাকার স্পোর্টস ক্লাবগুলোয় ‘হাউজি’ আসরকে ক্যাসিনোতে উন্নীত করা হয়। এ কাজে সম্রাটের সহযোগী হিসেবে পরিচিতি পান খালেদ। তার দেওয়া তথ্য মতে, এসব ক্লাবের ক্যাসিনোতে খেলা এবং সেগুলো পরিচালনায় যুক্ত হন আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রভাবশালী কয়েকজন নেতাও। খালেদের এই স্বীকারোক্তিতে বিব্রতবোধ করছেন জিজ্ঞাসাবাদকারী গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। তাকে জিজ্ঞাসাবাদকারী সূত্র বলেছে, এখন পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে খালেদের তথ্যে ফেঁসে যেতে পারেন পুলিশ সদর দফতর ও মহানগর সদর দফতরের সাবেক ও বর্তমান মিলিয়ে অনেক শীর্ষ কর্তা; মহানগরের মতিঝিল, রমনা, তেজগাঁও, মিরপুর, গুলশান ও উত্তরা বিভাগের অনেক পুলিশ কর্মকর্তাও।

জিজ্ঞাসাবাদকারী সূত্র বলছে, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকেই ক্যাসিনো কারবারের ‘গডফাদার’ দাবি করেছেন খালেদ। এর বাইরে যুবলীগের শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতাসহ ঢাকা সিটি করপোরেশনের অনেকের নাম বলেছেন খালেদ।
বাংলাদেশে কতো হাজার কতো লাখ শামিম-খালেদ রয়েছে তার পরিসংখ্যান কারো জানা নেই।  জানা নেই শামিম-খালেদদেরকে অবৈধ সুবিধা দিয়ে কতো লাখজন অবৈধ সম্পদ বানিয়েছেন? শেখ হাসিনা সারা দেশের শামীম-খালেদের মতো হাজারো লক্ষ শামিম-খালেদের কমিশনপ্রাপ্ত দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী, প্রকৌশলী, আমলা, পুলিশ, তাদের উর্ধস্তন ও অধোস্তন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কেরাণী-পিয়নদের ধরবেন কী? এদেরকে ছাড় দিয়ে দু’চারজন শামিম-খালেদকে ধরার মানে হয় না। এটা হবে লোক দেখানো, যা শেখ হাসিনার অবস্থানকে আরো নড়বড়ে করবে।
দুর্ভাগ্যক্রমে শামিম-খালেদ শেখ হাসিনার ‘তুলসীপাতা’ সাজার ‘বলির পাঠা’। দেশ ও সমাজের শত্রু কেবল কী শামিম, খালেদ কিংবা ছাত্রলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক অথবা আরো কয়েক শ’ কিংবা কয়েক হাজার, কয়েক লাখ? বাকীদেরকে, সবাইকে কী ধরা হবে? দরবেশের কী হবে? সুইসব্যাংকসহ যারা বিদেশে টাকা জমিয়েছে, সেকেন্ড হোম কিনেছে, আমেরিকায়, কানাডায়, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপে, অস্ট্রেলিয়ায়, মালয়েশিয়া, ডুবাইয়ে, ভারতে বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিনেছে তাদেরকে কী ধরা হবে?   মুনতাসীর মানুন, মুরগি বেপারী শাহরিয়ার, ইনু, মেনন, এরশাদ বাহিনী কী ধরা পড়বে? এদেরকে ধরা না হলে তো শেখ হাসিনা নিজে এবং তাকে বাহবা দেয়া মন্ত্রীদের ঘোষণা ‘কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না’ মিথ্যে হয়ে যাবে। এই ঘোষণা কতোটা আন্তুরিক?  এদেরকে কে ধরবে? যারা ধরবেন তারা কী সৎ ? তাদেরকে কে ধরবে? সোনাগাজির ওসি কিংবা দুর্নীতি কমিশনের পরিচালক এমনকি নির্বাচন কমিশনের অফিস সহকারী জয়নাল, বালিশচোর, পর্দাচোর, বইচোর, বিশ্ববিশ্যালয়ের টাকাচোর চুরি, শেয়ার বাজার-বাংলাদেশ ব্যাংক অন্যান্য ব্যাংক-সেঞ্চুরী-হলমার্ক-বিসমিল্লাহ’র অর্থচুরি, এদের মিছিল অনেক লম্বা?  আদালতে যে অর্থের লেন দেন হয়, শেখ হাসিনা কী  তা জানেন না? শেখ হাসিনা কোথায় হাত দিবেন? তিনি যেখানেই হাত দিবেন সেখানেই বঙ্গবন্ধুর ভাষায় ‘চোরের খনি’ রয়েছে।

আওয়ামী পরিবারের সবাই স্ব স্ব স্থানের রাজা। তাদের নির্দেশে ওই জায়গা চলে। এটাই কারণেই দুর্নীতি হয়েছে। তিনি দুর্নীতিবাজদের বিচার করেন নি। ধরেন নি। ভিসি তার বেয়াড়া অধীনস্থদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেন, জব্দ করেন,  যা সরাসরি অপরাধ। ভিসির অপকর্মের প্রতিবাদী শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেয়া হয়। ওসি  ধর্ষিতাকে জোর করে ধর্ষণকারীর সাথে বিয়ে দেন কিসের বিনিময়ে? কোন ওসি সৎ? কোন আমলা সৎ? কোন নেতা সৎ?

এইসব কাহিনী লিখে শেষ করা যাবে না। পাঠকদেরও ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চাই না। শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত একই জালে বিরোধী দলীয় নেতাদের নাম-গন্ধ আবিষ্কার করেন কী না, তা-ই দেখার বিষয়। শেখ হাসিনা তার দলকে দুর্নীতিমুক্ত করার ক্ষমতা রাখেন না। সাবেক ও বর্তমান মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত কেউই অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগমুক্ত নন। নিরপেক্ষ তদন্ত চালালে আওয়ামী পরিবারের ৯৯ শতাংশ সদস্য অবৈধ সম্পদের অধিকারী। এদেরকে শেখ হাসিনা ধরবেন? এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। আর এদেরকে ধরলে আওয়ামী লীগ থাকে না। কারণ কম্বলের পশম বাছতে গেলে কম্বল থাকে না।
অতি সৎ প্রমাণ করতে গিয়ে শেখ হাসিনা বিপাকে পড়েছেন। এই কথিত অভিযান থেকে সরতেও পারবেন না, আবার কম্বলের পশমও তুলতে পারবেন না। তিনি শাঁখের করাতে, উভয় সংকটে পড়েছেন। দেখা যাক তিনি কোন দিকে যান? তার অভিযান কোথায় গিয়ে ঠেকে?
রচনাকাল: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯