স্মরণ: স্যার সলিমুল্লাহ্

স্যার সলিমুল্লাহ্র নাম শোনেনি, বাংলাদেশে শিতি লোকদের মধ্যে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না বলেই আমার বিশ্বাস। উনিশ শতকের শেষ, এবং বিশ শতকের গোড়ার দিকে, বৃটিশ ভারতে পিছিয়ে পড়া পূর্ব বঙ্গের অর্থনীতি, সমাজ, শিক্ষা, ও সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য, স্যার সলিমুল্লাহ্র অবদান অনেকেরই অজানা, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মধ্যে তো বটেই। নিজেও জানতাম না, এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষদের রাজনৈতিক, সামাজিক, ও অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে, তিনি কেবলই তাঁর অগাধ সম্পদ বিলিয়ে দেননি, মাত্র ৪৪ বছর বয়সে, শত্রুদের ষড়যন্ত্রে বিষ পানে নিজের জীবনটাও দিয়ে গেছেন। সলিমুল্লাহ্ মেডিক্যাল কলেজ, আহসানউল্লাহ্ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমানে যা বাংলাদেশ প্রকৌশল ও কারিগরী বিশ্ববিদ্যালয় সংক্ষেপে বুয়েট), আহসানউল্লাহ্ এতিমখানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, নারায়ন গঞ্জের সলিমুল্লাহ রোড, এ ছাড়া বাংলাদেশের আরো অনেক প্রতিষ্ঠানের সাথে স্যার সলিমুল্লাহ্র নাম ওতোপ্রতভাবে জড়িয়ে আছে। তিনি ঢাকা সহ পূর্ব বঙ্গের বিভিন্ন জায়গায়, মসজিদ, মাদ্রাসা, ছাত্রদের জন্য আবাসিক হোস্টেল, হাসপাতাল, এতিমখানা করে গেছেন। পূর্ব বাংলার কৃষি উৎপাদন ও হস্ত শিল্প সম্পসারণের জন্য তিনি নিজ খরচে ঢাকায় কৃষি পণ্য ও হস্ত শিল্প প্রদর্শণীর আয়োজন করেছেন।

স্যার সলিমুল্লাহ্র পূর্বপুরুষ খাজা আব্দুল হাকিম, মোগল সম্রাট মোহাম্মদ শাহ্র আমলে কাশ্মীরের গভর্ণর ছিলেন। ১৭৩৯ সালে নাদির শাহ যখন ভারত আক্রমন করে, তখন খাজা আব্দুল হাকিম তৎকালীন আসামের অন্তর্গত সিলেট অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করেন। তাঁরই বংশধর খাজা আলীমুল্লাহ্  উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ঢাকায় এসে প্রথমে ব্যবসা এবং পরে জমিদারী প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম থেকেই ঢাকার নওয়াব পরিবার পূর্ব বঙ্গের  অনগ্রসর জনগোষ্ঠির আর্থ সামাজিক উন্নয়নের ব্যাপারে ছিলেন খুবই মনোযোগী, মুক্তহস্ত, স্পর্শকাতর, এবং যত্নশীল ।

 

স্যার সলিমুল্লাহ্র জন্ম হয় ১৮৭১ সালের ৭ই জুন ঢাকার আহসান মঞ্জিলে। তাঁর পিতার নাম ছিল নওয়াব খাজা  আহসানউল্লাহ্ এবং মা ছিলেন বেগম ওয়াহিদুন্নেছা। তাঁর দাদা  খাজা আব্দুল গনি মিঞা প্রথম নবাব টাইটেল পান যাঁর নামেই রাখা হয়েছে ঢাকার সচিবালয়ের দণি পাশের রাস্তার নাম। পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী, স্যার সলিমুল্লাহ্ ছোটবেলা স্কুলে না গিয়ে, ঘরোয়া পরিবেশে উর্দু, আরবী, ফার্সী, এবং ইংরেজী শেখেন। ১৮৯৩ সালে তিনি ইংরেজ সরকারের অধীনে ডেপুটি ম্যাজিট্রেটের চাকরী নেন। মাত্র দু বছর পর, চাকরী ছেড়ে দিয়ে ময়মনসিংহে গিয়ে পাটের ব্যবসা শুরু করেন।

১৯০১ সালে পিতার মৃত্যু হলে, প্রথম ছেলে হিসেবে, স্যার সলিমুল্লাহ্ আহসান মঞ্জিলে ফিরে এসে, নওয়াব টাইটেল নিয়ে,  পুরো জমিদারীর দ্বায়িত্ব নেন। তখন কলকাতাকে রাজধানী করে, পূর্ব বঙ্গ, পশ্চিম বঙ্গ, বিহার, ও উড়িষ্যা মিলে ছিল এক বিশাল প্রদেশ। এর মধ্যে পূর্ব বঙ্গ ছিল সবচেয়ে উপেতি।  পূর্ব বঙ্গ ও আসামকে নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ গড়ার জন্য ১৯০৩ সালে শুরু হয় বঙ্গ ভঙ্গ আন্দোলন। ওই আন্দোলনের মাধ্যমে স্যার সলিমুল্লাহ্  প্রত্য রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।  তিনি বঙ্গ ভঙ্গ আন্দোলনের স্বপে  জনমত গঠনের জন্য সহযোগীদের নিয়ে সারা পূর্ব বঙ্গ চষে বেড়াতে লাগলেন। তাঁরই ডাকে, ১৯০৪ সালের ১১ই জানুয়ারি আহসান মঞ্জিলে পূর্ব বঙ্গের নেত্রীস্থানীয় হিন্দু মুসলমান ব্যক্তিদের এক গুরুত্বপূর্ণ সভা বসে। ওই সভায় তিনি বঙ্গ ভঙ্গ পরিকল্পনার কিছু কিছু বিষয়ের বিরোধীতা করে তাঁর দৃঢ় মতামত ব্যক্ত করেন। এক মাস পর, ফেব্রুয়ারি ১৮-১৯ তারিখ বড়লাট লর্ড কার্জন ঢাকা আসেন এবং স্যার সলিমুল্লাহ্র আথিতেয়তা  গ্রহন করেন। তখন বড়লাটের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে, স্যার সলিমুল্লাহ্ বঙ্গ ভঙ্গ পরিকল্পনার সব খুঁটিনাটি বিষয়ের চূড়ান্ত মিমাংসা করেন। সেই সমঝোতা অনুযায়ী, ১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর ঢাকাকে রাজধানী করে, পূর্ব বঙ্গ ও আসাম নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ গঠিত হয়।

 

ঢাকা কেন্দ্রিক নতুন প্রদেশ হওয়ার ফলে, ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত, পূর্ব বঙ্গের ভীষণভাবে পিছিয়ে পড়া সাধারণ জনগনের মধ্যে ছাত্র ছাত্রীদের স্কুল কলেজে ভর্তির হার বেড়ে যায় ৩৫ শতাশেংর ওপরে। প্রাদেশিক সরকারের আনুকূল্যে, এখানকার ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা নতুন উদ্যমে ব্যবসা বাণিজ্য শুরু করেন। ১৯০৬ সালে  আঞ্চলিক সওদাগররা চট্টগ্রাম - রেঙ্গুণ জাহাজ সার্ভিস চালু করেন। ওই সময়ে, পূর্ব বাংলার মানুষদের জন্য এর প্রত্যেকটি ছিল একেকটি সফলতার মাইল ফলক।

 

যে দিন বঙ্গ ভঙ্গ অধ্যাদেশ কার্যকর হয়, সেদিনই স্যার সলিমুল্লাহ্র সভাপতিত্বে ঢাকার নর্থব্র“ক হলে পূর্ব বাংলার মুসলমান নেতাদের এক সভা হয়। ঐ সভায় “মোহামেডান প্রভিন্সিয়াল ইউনিয়ন” নামে মুসলমানদের একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম তৈরি হয়। পরবর্তীকালে, এই প্ল্যাটফরমের ওপর ভিত্তি করে, স্যার সলিমুল্লাহ্র পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকায় জন্ম হয় সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের। স্যার সলিমুল্লাহ্র আমন্ত্রনে ১৯০৬ সালের ডিসেম্বর ২৭-৩০ এই তিন দিনের জন্য নবাবের শাহবাগের বাগান বাড়ীতে এক বিরাট সর্ব ভারতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে, গোটা ভারত থেকে ২ হাজার  মুসলমান ডেলিগেট ঢাকায় আসেন। অথিতিদের তিন দিনের থাকা খাওয়া এবং সম্মেলনের অন্যান্য যাবতীয় খরচ বাবত স্যার সলিমুল্লাহ্ তাঁর নিজস্ব তহবিল থেকে অনুদান দিয়েছিলেন ৬ ল টাকা। ১৯০৬ সালের ৬ ল টাকার মূল্যমান আজকে কত হতে পারে পাঠক পাঠিকারা সহজেই অনুমান করে নিতে পারেন।

বঙ্গ ভঙ্গের ফলে  স্থাপিত নতুন প্রদেশে শান্তি শৃঙ্খলা রার জন্য ১৯০৯ সালের  ২১ মার্চ, হিন্দু মুসলমান নেতাদের একসাথে করে তিনি “ইম্পেরিয়াল লীগ অফ ইষ্ট বেঙ্গল এন্ড আসাম” নামে একটি শক্তিশালী সামাজিক সংস্থা প্রতিষ্ঠা  করেন। নতুন প্রদেশে পূর্ব বঙ্গের সাধারণ জনগনের নতুন মতায়নের ফলে,  জোতদার জমিদার মহাজন ও কলকাতা কেন্দ্রীক কিছু কিছু সুবিধাবাদী পেশাজীবিদের স্বার্থে দারুণ আঘাত লাগে। তাই, কোনো অবস্থাতেই তারা বঙ্গ ভঙ্গকে মেনে  নিতে পারেনি। তারা এর বিরুদ্ধে গোটা প্রদেশ জুড়ে গুপ্ত হত্যা ও সন্ত্রাসী আন্দোলন শুরু করে। স্যার সলিমুল্লাকে বৃটিশ রাজের শত্রু হিসেবে ঘোষণা দেয়। ওই সময় তাঁকে কুমিল্লায় গুলি করে হত্যার চেষ্টা হয়, একই সময় কুমিল্লা থেকে ঢাকা ফিরে আসার পথে তাঁর ট্রেন লাইনচ্যুত করা হয় তাঁকে হত্যার দ্বিতীয় প্রচেষ্ঠা হিসেবে।

বঙ্গ ভঙ্গের বিরুদ্ধে,  সন্ত্রাসী আন্দোলনের তীব্রতা বাড়লে, ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে বৃটিশ রাজ, বঙ্গ ভঙ্গ রহিত করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৯১১ সালের ডিসেম্বরে রাজা পঞ্চম জর্জ দিল্লির দরবার হলে এই মর্মে ঘোষণা দেন। এই ঘোষণা কার্যকর হয় ১৯১২ সালের ১লা এপ্রিল। একই সময়ে বৃটিশ ভারতের  রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয়। বঙ্গ ভঙ্গ রোধের ফলে স্যার সলিমুল্লাহ দারুণভাবে আশাহত হয়ে বৃটিশদের ওপর ভীষণভাবে ুব্ধ ও অসন্তুষ্ট হন। প্রতিবাদে তিনি বৃটিশ রাজের দেওয়া জিসিআইই ব্যাজ ছুড়ে ফেলে দেন এবং অনতি বিলম্বে রাজা পঞ্চম জর্জের কাছে পূর্ব বঙ্গের অবহেলিত জনগনের স্বার্থ রার জন্য একটি আট দফা দাবী পেশ করেন। এই সব দাবীর মধ্যে ছিল ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়, হাই কোর্ট, এবং কেন্দ্রীয় সরকারের একজন শিক্ষা অফিসারের পদায়ন।  হাই কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তিনি ঢাকার রমনায় প্রয়োজনীয় জমি সম্প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন। তাঁর মুত্যুর পর, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়, হাই কোর্ট, ও কেন্দ্রীয় শিক্ষা অফিসারের দাবী বাস্তবায়িত হয়।

১৯১৫ সালের ১৬ই জানুয়ারি তাঁর কলকাতার চৌরঙ্গীর বাড়ীতে স্যার সলিমুল্লাহ্কে মৃত পাওয়া যায়। মৃত্যুর অব্যবহিত পর, যাঁরা মৃতদেহের বিবর্ণ চেহারা ও মুখের বিকৃতি দেখেছেন, তাঁদের কাছে মনে হয়েছে স্যার সলিমুল্লাহ্কে বিষ পানে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর লাশ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সিলগালা করা কফিনে বৃটিশ সৈন্যদের কড়া পাহারায় নদী পথে কলকাতা থেকে ঢাকায় আনা হয় এবং বেগম বাজারে তাঁদের পারিবারিক গোরস্থানে সমাহিত করা হয়। স্যার সলিমুল্লাহ্র লাশ যখন ঢাকার সদর ঘাটে আসে, তখন হাজার হাজার মানুষ শেষ বারের মত তাদের প্রিয় নবাবের  মুখ দেখতে চেয়েছিলো, কিন্তু পাহারারত বৃটিশ সৈন্যরা কাউকেই লাশের চেহারা দেখতে দেয়নি। এমন কী তাঁর স্ত্রী সন্তান এবং আত্মীয় স্বজনরাও শেষ বারের মত মৃত নবাবের মুখ দেখতে পাননি। লাশ দাফনের পর, বৃটিশ সৈন্যরা আহসান মঞ্জিল এবং স্যার সলিমুল্লাহ্র কবরের চার পাশ দিন রাত চব্বিশ ঘন্টা ঘেরাও করে রেখেছিল দীর্ঘ ছয় মাস ধরে। ঘটনাদৃষ্টে এরকম মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়, যারা বঙ্গ ভঙ্গ আন্দোলনের বিরোধী ছিল তারাই বৃটিশ রাজের যোগ সাজোশে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে স্যার সলিমুল্লাহ্কে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পৃথিবী থেকে চিরতরে সরিয়ে দিয়েছিলো। কারণ বঙ্গ ভঙ্গ রহিত হওয়ার পর, তিনি বঙ্গ ভঙ্গ বিরোধীদের এবং বৃটিশ রাজের সমালোচনায় অনেক কড়া কড়া বক্তৃতা বিবৃতি দিয়েছিলেন।

এটা হয়ত কোনো দিনই আর জানা যাবে না, কী ভাবে স্যার সলিমুল্লাহ্র মৃত্যু ঘটেছিলো। তবে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের অবশ্যই জানা উচিৎ স্যার সলিমুল্লাহ আমাদের পূর্বপুরুষদের অর্থাৎ তৎকালিন পূর্ব বাংলার অনগ্রসর জনগোষ্ঠিকে ঘুম থেকে জাগানোর জন্য কী করে গেছেন ! স্যার সলিমুল্লাহ, বৃটিশ ভারতে পূর্ব বাংলার হত দরিদ্র মানুষদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে শুধু প্রথম কাতারের একজন সৈনিকই নন, বরং প্রথম দিককার একজন শহীদও বটে।