শিরোনাম
  • রাজধানীতে গুলি করে আড়াই লাখ টাকা ছিনতাই

  • সিলেটে জাল টাকা ও মেশিনসহ ৩ জন আটক

  • শৈলকূপায় গলিত লাশ উদ্ধার
  • বাসের মধ্যে প্রসব, সহৃদয় চালক নিয়ে গেলেন হাসপাতালে
  • মুন্সীগঞ্জে ইউপি চেয়ারম্যানের স্ত্রীর লাশ উদ্ধার
  • টাঙ্গাইলে নারী এনজিও কর্মীকে কুপিয়ে টাকা ছিনতাই
চিরসত্য
হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তার এবাদত কর, যিনি তোমাদিগকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদিগকে সৃষ্টি করেছেন। তাতে আশা করা যায়, তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পারবে। । সূরা আল বাক্বারাহ (মদীনায় অবতীর্ণ), আয়াত:-২১
সাম্প্রতিক
প্রবন্ধ
সরকার না হয় রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট, প্রশাসনও কি অন্ধ?

দু’দিন আগে ঢাকার একটি অবিস্মরনীয় ঘটনা দেশে বিদেশে ব্যাপক চ্যাঞ্চল্যের জন্ম দিয়েছে। তা হলো বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর জানাজায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি। অরাজনৈতিক এ ব্যক্তির আকস্মিক মৃত্যু ও পরবর্তী বিভিন্ন ঘটনা জনমনে সৃষ্টি করে বিপুল আগ্রহের। ১৯৮১ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজায় অংশগ্রহণকারী বিশাল সংখ্যার অপরিমেয় জনমানুষ বাংলাদেশের ৪৫ বছরের ইতিহাসে এখনও একটি আলোচ্য বিষয়। এরপরে তদীয় পুত্র কোকোর জানাজা আরেকটি বৃহত্তম সমাবেশ। উল্লেখ করা যায়, উপমহাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ইন্দিরা গান্ধীর স্নেহের পুত্র সঞ্জয় গান্ধীর মৃত্যূতে কারও টনক নড়েনি। বিস্ময়করভাবে ঢাকায় জানাজার অনুষ্ঠানে এত বড় সমাবেশ হয়ে গেলো, অথচ বাংলাদেশের গনমাধ্যমগুলি তা সরাসরি সম্প্রচার করতে পারেনি। অনেক ছোটখাট বিষয়কে লাইভ টেলিকাস্ট করার নজীর এখানে বিদ্যমান। জনমনে বিপুল আগ্রহ থাকলেও টিভি চ্যানেলগুলি তা সরাসরি দেখাতে পারেনি।এর কারন হিসাবে সবাই মনে করেন, টিভি চ্যানেলগুলো সরকারের কঠোর সেন্সরশীপের মধ্যে রয়েছে। কেননা কয়েকদিন আগে খালেদা জিয়ার আরেক পুত্র তারেক রহমানের বক্তব্য লাইভ টেলিকাস্ট করার কারনে একুশে টিভির কর্নধার আবদুল সালামকে রাতের আধারে চোর ছ্যাচ্চোরের মত গোয়েন্দা পুলিশ তুলে নিয়ে যায় রাস্তা থেকে, এরপরে একাধিক মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে ঢুকিয়ে রেখেছে। এমনকি ঐ টিভি চ্যানেলটির প্রদর্শর্নীও সরকার সীমাবদ্ধ করে দেয় কয়েকদিন। অখিল পোদ্দারের নেতৃত্বে সরকার পন্থীরা ক্যু করে টিভি সংবাদ থেকে মালিকপন্থী ৫ জন কর্মকর্তাকে বহিস্কার করে। এরপর থেকে একুশে টিভি সরকারের প্রতি চরম আনুগত্য প্রদর্শন করে চালু আছে। পরবর্তীতে সরকারের সিনিয়র মন্ত্রীরা অন্যান্য সব টিভির মালিকদেরকে ডেকে একুশে টিভির নজির দেখিয়ে তাদের প্রেসক্রিপশন মোতাবক চলার জন্য মোলায়েম সুরে ধমক দেয়। আর তাতেই কাজ হচ্ছে। সরকারের পছন্দমত খবর প্রচার করছে; অন্যদিকে রাজনৈতিক কর্মকান্ড, এমনকি জনগনের প্রত্যাশিত খবর ও মাঠে ময়দানের বাস্তব চিত্রও টিভিতে প্রদর্শন করা যাচ্ছে না। টক-শোতে স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছে না আলোচকরা। সরকারের সমালোচনাকারী আলোচকদেরকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ প্রাণ ভয়ে দেশ ছেড়েছেন। আরাফাত রহমান কোকো, যার জন্মই হয়েছে একজন সেনা কর্মকর্তার সন্তান হিসেবে--সামরিক কবরস্থাণে দাফন পাওয়া তার জন্মগত অধিকার। সে জন্মগত অধিকারকে এই প্রথমবারের মতো বাতিল করে তাকে কবরস্থানের মাটি থেকে বঞ্ছিত করলেন দেশের বিপুল ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান দিলেন, কেবল জীবিত অবস্থায়ই নয়, তার বিরোধী পক্ষের লোকজনকে মৃত্যুর পরেও শায়েস্তা করতে তিনি পারঙ্গম! কোকো যদি একজন সেনাপ্রধানের পুত্র হওয়ার পরেও বিধি মোতাবেক কবরের মাটি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন, তবে ভবিষ্যতে এ নজির অনুকরণে বহু ঘটনা ঘটতে পারে, তা বলাই বাহুল্য। দেশের যে সেনাপ্রধান, এ ধরণের অনৈতিক কর্মকান্ডে রাজনৈতিক নির্দেশনাকে সায় দেন, তার বাহিনীর কাছে তিনি কি রকম নপুংশক হিসাবে পরিচিত হয়ে আছেন, সেটা সামাজিক মাধ্যমগুলিতে আলোচনা হচ্ছে। অন্যদিকে, ম্যান্ডেটহীন প্রধানমন্ত্রী ও অত্যানুগ সেনাপ্রধানকে জাতি জবাব দিয়েছে একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তির জানাজায় লাখ লাখ হাজির হয়ে! এই সদ্যমৃত কোকোর নামে বিগত ৬ বছর ধরে আওয়ামীলীগ সরকার চালিয়েছে একতরফা প্রোপাগান্ডা, যদিও তার ছিল না কোন রাজনৈতিক প্রোফাইল। কেবল তার মা হলেন বর্তমান সরকারপ্রধানের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, এই অযুহাতে চলেছে বিরামহীন চরিত্রহরণ। সরকারের এসব প্রচারণা কি কাজে দিয়েছে? দলমত নির্বিশেষে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করছে, সরকারের এসব অপতৎপরতাকে জনগন গ্রহণ করেনি। প্রধানমন্ত্রী গতকাল পুলিশকে হুকুম দিয়েছেন, বিরোধী দল দমনে সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা নিতে, এ জন্য সকল দায়িত্ব নিবেন তিনি নিজে (শেখ হাসিনা)। প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশের মধ্যে স্বৈরাচারের শেষ বেলার গন্ধ পাওয়া যায়। দুনিয়ার সব স্বৈরাচারই পতনের আগে অস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিবাদী জনতাকে হত্যা করে গদি টিকাতে গিয়ে শেষে ব্যর্থ হয়। কার্যত, গত একবছর ধরে বাংলাদেশকে পরিণত করা হয়েছে পুলিশী রাষ্ট্রে- যেখানে জনতা রাস্তায় নামলেই পুলিশ রাইফেলের গুলিতে সব পন্ড করে দেয়, রাজধানীতে বিরোধী দলের সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়েছে, বিচার বিভাগ সরকারের পদানত, বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের কয়েক’শ নেতাকর্মী আটকের পরে ফিরে আসে লাশ হয়ে- বলা হয় বন্দুক যুদ্ধ, যৌথ অপারেশন করে বাড়িঘর জ্বালিয়ে লোকজন বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে সরকারী বাহিনী। এরপরে বিরোধী দল দমনে আর কি কঠোর ব্যবস্থা বাকী রইল? এখন ডা করতে পারে, ঘরে ঘরে ঢুকে বিরোধী দলের নেতাকর্মী হত্যা করা, আর এদের অফিস আদালত বাড়িঘর ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেয়া। তেমন কিছু করার জন্য কি প্রস্তুত পুলিশ বা র‌্যাব? আমাদের স্বল্পকালীন গণতান্ত্রিক চর্চার ইতিহাসে ৫ জানুয়ারী ২০১৪ এক কালো দিন। সেদিন সংখ্যাগরিষ্ট জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে, জাতিসংঘসহ বিদেশী বন্ধু রাষ্ট্রের পরামর্শ উপেক্ষা করে, সকল বিরোধী দলের প্রতিবাদ ও বাধার মুখে, বাংলাদেশে সংবিধান রক্ষার নামে আওয়ামীলীগ সরকার নির্বাচন কমিশন ও মাঠ প্রশাসনকে কব্জা করে প্রহসনমূলক একদলীয় একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করে, যা ছিল ব্যাপক সংঘাতময়। সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট ১৫৩টি আসনে অসাংবিধানিকভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে বিনাভোটে ফলাফল ঘোষণা করা হয়। বাকী ১৪৭টি আসনে নগন্য ভোটাধিকারে (শতকরা ৫/১০ ভাগ) সম্পূর্ন অবৈধ একটি সংসদ গঠিত হয়, যদিও ব্যাপক কারচুপি ও ফল জালিয়াতি করে ৪০ ভাগ ভোট কাষ্টিং দেখানো হয়। এসব ঘটনাবলী দেশের জনগণ ও প্রশাসনের সম্পূর্ন অবহিত। নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে ও পরে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে সমঝোতার লক্ষ্যে নানাবিধ কূটনৈতিক উদ্যোগ চলতে থাকে, যার সর্বশেষ পরিণতি হয়- খুব দ্রুততার সাথে আরেকটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের আশ্বাসের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সরকার গঠনের পর ক্ষমতাসীন দল ক্রমশ তাদের প্রতিশ্রুতি থেকে সরতে থাকে। অন্যদিকে, প্রতিবাদী বিরোধী শক্তিকে কঠোর হাতে দমন করা হয়, রাজনৈতিক সভা সমাবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়, সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী আগ বাড়িয়ে বিরোধী দলকে নির্মুল করার ঘোষণাও দেন। প্রতিশ্রুত নির্বাচনের আশায় ৩ মাস থেকে ৬ মাস, ৬ মাস থেকে এক বছর অপেক্ষার পর অবৈধ নির্বাচনের বছর পুর্তিতে ৫ জানিুয়ারী ২০১৫ বিরোধী দলীয় জোট রাজধানীতে সমাবেশ করতে চাইলে সরকার নিষেধাজ্ঞা জারী করে, বিরোধী দল সমুহের প্রধান নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অফিসের মধ্যে অন্তরীণ করে রাখে ২ সপ্তাহ, এমনকি তার বাড়ির চারপাশে ইট বালি সিমেন্টের ট্রাক দিয়ে রাস্তা আটকে দিয়ে সারা বিশ্বে বাংলাদেশকে হাসির পাত্রে পরিণত করে। বাধ্য হয়ে বিরোধী দল টানা অবেরোধের ডাক দেয়। সেই অবরোধের মধ্যেই অবরোধকারী এবং সরকার উভয় আক্রমণের শিকার হয় মূলত গণপরিবহন, আহত নিহত হয় নিরীহ জনতা। সরকার নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ায় জোরেসোরে প্রোপাগান্ডা চলছে, বিরোধী দল অবরোধের নামে পেট্রোল বোমা দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ মারছে। বার্ন ইউনিটের যন্ত্রণাক্লিষ্ট মানুষদের একই ছবি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বার বার টিভিতে প্রচার করে জনগণকে সেনসেটাইজ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেখানে সভ্য দেশে এসব ছবি মিডিয়ায় প্রকাশে নিষেধ। অন্যদিকে পুলিশ, র‌্যাব, ও বিজিবি প্রধানরা ঘন ঘন উচ্চারণ করছেন, “গুলি চালাবো।” গুলি তো থেমে নেই, যেখানে সরকারী বাহিনীর গুলিতে প্রতিনিয়ত মানুষ মরছে। সকলেরই জিজ্ঞাসা, পেট্রোল বোমা মারার সাথে জড়িত কারা? সরকার বলছে- অবরোধকারীরা। প্রশ্ন হলো, অবরোধের কর্মসূচিতে বিরোধী দল কি কাউকে পেট্রল বোমা মেরে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছে? না। তাহলে কিছু আরো প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক। ২০০৪ সালের ৪ জুন শাহবাগে গানপাউডার দিয়ে একটি দোতলা বাস পুড়িয়ে ১১ বাসযাত্রী হত্যা করেছিল কারা? এর উত্তর মেলে বর্তমান সরকারী দলের প্রভাবশালী নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর ভাই শেখ সেলিমের কাছে। জিজ্ঞাসাবাদকালে নিজ মুখে সেলিম বলেছেন, ওই কাজটির জন্য দায়ী ছিলেন বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের অংগসংগঠন যুবলীগ সভাপতি জাহাঙ্গীর কবীর নানক এবং মীর্জা আজম, যারা কেবিনেটের পদ অলঙ্কৃত করেছেন পরে! অবরোধ যারা ডেকেছেন সেই নেতারা যদি পেট্রল বোমার জন্য দায়ী হবেন, তবে চলমান অবরোধকালে বহু যায়গায় (ফেনী, চাঁদপুর, কুমিল্লা, মাগুড়া, চাপাই নবাবগঞ্জ) সরকারী দলের কর্মীদের হাতে কেনো পাওয়া যাচ্ছে পেট্রোল বোমা বা ককটেল? প্রশ্ন আরো আছে- গত ২৩ জানুয়ারী যাত্রাবাড়িতে এক গাড়ি পুলিশ পাশে রেখে পেট্রোল বোমা ছুড়ে কারা অগ্নিদগ্ধ করেছে ৩১ যাত্রীকে? এরা কি সরকারী দলের, নাকি বিরোধী পক্ষের লোক, তা সহজেই অনুমেয়। কেননা, চোখের সামনে বাসে বোমা মারার পরও বোমা নিক্ষেপকারীদের ধরতে দেখা যায় না পুলিশকে, বরং পুলিশের ঐ গাড়িটি ব্যবহার হয় আহতদের বার্ন ইউনিটে নিয়ে যাওয়ার কাজে। এটা যেনো সিনেমার গল্পের মত, ঘটনা ঘটার আগেই লাশ নিতে গাড়ি হাজির। অথচ সরকার মামলা দায়ের করে খালেদা জিয়া ও তার দলের সিনিয়র নেতাদের নামে! এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর পুলিশের কাছে আছে, যদিও তারা মুখ খুলবে না। পেট্রল বোমায় মানুষ মারা, গাড়ি ভাঙচুর, জনগণের সম্পদ ক্ষতি করা কোনোভাবেই রাজনৈতিক কর্মসূচি হতে পারে না। তবে রাজনীতিতে হরতাল অবরোধ বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। জনগণের অনিষ্ট বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হবে, এ নিয়ে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দলের অধিকার হরণ আর অত্যাচার নির্যাতন থেকে যে রাজনৈতিক সহিংসতার সূত্রপাত, তা নিয়ে কারো কোনো দ্বিমত থাকার কথা নয়। গায়ের জোরে কারো অধিকার খর্ব করা হলে সেখানে বিদ্রোহ ও বিপ্লব হতে বাধ্য। পৃথিবীর বড় বড় বিপ্লবের দিকে তাকালে দেখা যাবে, সেখানেও ছিল ব্যাপক সংঘাত, সহিংসতা। শান্তির জন্য বিখ্যাত মহাত্মা গান্ধীও যুদ্ধকালে সৈন্য যোগাড় করেছেন, যদিও তার পলিসি ছিল নিজের দুর্বল সময়ে শান্তি আর সবল হলে যুদ্ধ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর কালে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের সংঘাত হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে, বিজয়ীদের হাতেই আন্দোলন ও সহিংসতাকে বিপ্লব হিসাবে মহিমান্বিত করা হয়ে থাকে, আর পরাজিত হলে তার ভাগ্যবরন হয় সন্ত্রাসী কার্যকলাপে। গতকালই শাসকদলের কয়েকজন মন্ত্রী দম্ভ ভরে হুমকি দিয়েছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্থান নাকি হবে কাশিমপুর কারাগারে। আর সরকারী দরের প্রকাশ্য হুমকি দিয়ে মুখপাত্র বলেন, জানাজা নিয়ে কোনরকম গোলমালের চেষ্টা হলে বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করা হবে। নিশ্চিহ্ন করার হুমকির নাম কি রাজনীতি? অথচ ঐদিনই স্মরণাতীত কালের সবচেয়ে বৃহত্তম জানাজার সমাবেশে শান্তিপূর্নভাবে হাজির হয় লক্ষ লক্ষ মানুষ। কোনরকম শান্তি ভঙ্গ না করে তা শেষ হয়, যা প্রমাণ করে ২০ দলীয় জোটের সমর্থকরা শান্তিপ্রিয়। বর্তমান বাংলাদেশে যে আন্দোলন সংগ্রাম চলছে, সরকারী প্রচারনা অনুযাযী তা কি কেবল সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, নাকি এর রাজনৈতিক কার্যকারন সম্পর্ক রয়েছে? সরকার বলছে পেট্রোল বোমা মারছে বিরোধী দল; আর বিরোধী দলের দাবী, বিরোধী দলকে ঘায়েল করার জন্য সরকারই তাদের এজেন্ট দিয়ে এসব কাজ করাচ্ছে। তার মানে, এ কেবল সন্ত্রাসী কর্মকান্ড নয়, বরং এর একটা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। যে রাজনৈতিক কারন থেকে এ সংঘাতের সৃষ্টি, তা নিস্পত্তির ছাড়া চলমান সংঘাতের অবসান হওয়া অসম্ভব, এমনই মত দিলেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ডঃ সাদাত হুসাইন। তাকে সমর্থন করেছেন ডঃ মিজানুর রহমান শেলী। অন্যান্য বিজ্ঞজনেরা বলছেন, যে মাত্রায় এই সংঘাত সারা দেশে ছড়িয়েছে, তা কেবল পুলিশী ব্যবস্থা দিয়ে দমন করা সম্ভব হবে না। সাংবিধানিক ভাষায় সরকারী কর্মচারীরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। সরকারের শীর্ষ আমলাটি থেকে শুরু করে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, এমনকি সামরিক বাহিনীর বেতনও জোগান দেয় বাংলার সাধারন মানুষ। সে জন্যই এরা গণকর্মচারী। গণ-ম্যান্ডেটহীন সরকারকে গায়ের জোরে টিকিয়ে রাখার জন্য জনগণের পয়সায় পরিচালিত শৃঙ্খলাবাহিনী বা সামরিক বাহিনী জনগণের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে পারে না। গুলি বন্দুক সবই জনগণের পয়সায় কেনা। অন্যদিকে গণকর্মচারীরা গণতান্ত্রিক সরকারের হাত পা কান চোখ নাক হিসাবে কাজ করে থাকে। সরকারী কর্মচারীরা যেমন সরকারকে সহযোগিতা করবে, তেমনি তার মনিব তথা জনগণের স্বার্থটিও তাদেরকে দেখতে হবে। সরকারী কর্মচারীরা পক্ষাপাতহীনভাবে কাজ করার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ, যদিও বর্তমান বাংলাদেশে প্রশাসন পরিস্কারভাবে দ্বিধা বিভক্ত। দেশ ও জনগণের বাস্তব অবস্থা তুলে ধরা মাঠ প্রশাসনের গণকর্মচারীর অন্যতম দায়িত্ব। জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, বা কৃষি অফিসার তার অধিক্ষেত্রাধীন বিষয়ে সরকারকে জানাবেন, যাতে করে সঠিক সিদ্ধান্তটি নেয়া যায়। তা না করে, সরকারী কর্মচারী যদি দলীয় নেতার মত কাজ করেন, তবে আর বেতন দিয়ে আমলা পোষার দরকার কি, দলীয় নেতারাই তো সে কাজটি করে দিতে পারেন। প্রতিবেশী ভারতে রাজনৈতিক সরকার হচ্ছে অস্থায়ী, আর আমলা সরকার হচ্ছে স্থায়ী। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের দেশের সিভিল ও পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা হয়ে গেছে সরকারী চেয়ারে বসা দলীয় কর্মীর মত। জনগণের সঠিক তথ্যটি তারা ওপরে দেয়ার ক্ষেত্রে অনাগ্রহী, বরং সরকারের কাছে আমুদে খবর দেয়ায় উৎসাহী, যেখানে কখনও কখনও জনস্বার্থ হয় উপেক্ষিত। যার ফলে সরকারকে শুকতে হয় বাস্তবতা বিবর্জিত গন্ধ, কানে শুনতে হয় অবাস্তব সংবাদ। এ প্রসঙ্গে অনেক ঘটনার মধ্যে স্মরণ করতে পারি, ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে কর্মরত থাকাকালে যখন সরকার-বিরোধী “জনতার মঞ্চ” সংগঠিত হয়, তখন নির্দেশিত হয়ে গোপনে সাধারনের মধ্যে গিয়ে সেখানকার বাস্তব অবস্থা তুলে ধরেছি; কিংবা ১৯৯৪ সালে যখন বিরোধী দল সংসদ থেকে পদত্যাগ করে তখন সেখানে হাজির থেকে সঠিক অবস্থাটি জানানো; অথবা ২০০৪ সালের ২১ আগষ্ট গ্রেনেড হামলার পরে যখন বিরোধী দলের কর্মীদের প্রতিবাদের মুখে বিরোধীদলীয় নেতার বাসায় যেতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী, তখন শত প্রতিকূলতার মাঝেও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি হয়ে পত্র দিতে গিয়ে ধাওয়া খেয়ে ফেরত আসার অভিজ্ঞতার কথা। কিংবা আমার ব্যাচমেট রোকনউদ্দেলা ভেজাল দমনে সামান্য এক ম্যাজিস্ট্রেট থেকে পরিণত হয়েছে একটি প্রতিষ্ঠানে, আর সে সিলেকশনটি ছিল আমারই। কাজেই সরকারী কর্মচারীরা বিপসদংকুল পরিবেশে কাজ করতে পারবে না, এমন নয়। তাদের রয়েছে উপযুক্ত ট্রেনিং ও মেধা। কেবল দরকার সঠিক নেতৃত্ব ও ঈমানের জোর। বাংলাদেশের প্রশাসন কি সবসময় জনগণের বিপক্ষে থাকে? পুলিশ কি সর্বদা সরকারের রক্তচক্ষু হয়ে জনতার সামনে হাজির হয়? ব্রিটিশ-রাজের আমলে প্রশাসনের কাজ ছিলো "ট্যাক্টফুলি" জনগণের সম্পদ শোষণ করে বৃটিশ রাজের রাজকোষে জমা দেয়া, সেজন্য সৃষ্টি করা হয়েছিল ডিস্ট্রিক্ট কালেকটর বা ডিসি। প্রয়োজনমত জনগণকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে, বা ভয়ভীতি দেখিয়ে অথবা দমন করে সরকারী উদ্দেশ্য সাধন করতেন তাদের পাইক বরকন্দাজ নিয়ে ডিসি সাহেবরা। পাক আমলেও তার ধারাবাহিকতা অনেকটাই রয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশ সৃষ্টির পরে প্রশাসনের পুরোনো ধারণা পাল্টে নতুন তত্ত্ব প্রণয়ন করা হলো - 'ডেভেলপমেন্ট এ্যাডমিনিস্ট্রেশন'। তার মানে হচ্ছে প্রশাসনকে রাষ্ট্র তথা জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে উন্নয়নের পরিবেশ তৈরিতে নিয়ম, নীতি ও নৈতিকতার সাথে কর্মক্ষেত্রে অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে হবে। ক্ষমতাসীন দল বা অন্য কোনো দলীয় ক্ষুদ্র স্বার্থ রক্ষা করতে যেয়ে জনগণের বিপক্ষে রাষ্ট্র প্রদত্ত ক্ষমতার অপব্যবহার করা একটি অপরাধ। তাহলে প্রশাসন কি জনগণের ভাষা বুঝতে সক্ষম নয়? তারা কি রাজনৈতিক সরকারকে জনগণের সঠিক বার্তাটি পৌছে দিতে সমর্থ নয়? সময় বদলেছে। সাধারণ জনগণের শিক্ষা দীক্ষা বেড়েছে, সম্পদে স্বল্পাধিকারী হলেও সমষ্টিগত স্বার্থের বিষয়ে তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার এবং প্রতিবাদী। দু’দিন আগে কোকোর বিশাল জানাজা তার একটা জলন্ত প্রমাণ। এখন লোক ঠকানো অত সহজ নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের উক্তির “Any change is resisted because bureaucrats have a vested interest in the chaos in which they exist” সেই অবস্থা থেকে বদলে যাওয়ার সময় এসেছে। আর দেরী না করে বাংলাদেশের প্রশাসনকে প্রগতিবাদী ও গণমুখী হতে হবে। অন্যথায় পদ পরিবর্তনে অথবা মেয়াদ অবসানে আর্থিক সঞ্চয়ের থলি স্ফীত হতে পারে, কিন্তু আখেরে মিলবে শুধু জনগণের ঘৃণা আর ভৎর্সনা।

Back To Top